প্রেমময় ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও সৎসঙ্গ

ভক্তের আকুল প্রার্থনায় অস্তিত্বের পালন-পোষণের পথ দেখাতে যুগে যুগে আবির্ভূত হন স্বতঃপ্রজ্ঞাদীপ্ত মানব দেহধারী দ্রষ্টাপুরুষ। বর্তমান যুগে তিনি প্রেমের ঠাকুর, ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার আগমন বার্তা ঘোষিত হয় এক প্রবীন সন্ন্যাসীর কন্ঠে। পাবনা জেলার পদ্মার উত্তর তীরে হিমাইতপুর গ্রামে ১২৯৫-এর ৩০ ভাদ্র (১৪ সেপ্টেম্বর ১৮৮৮খ্রি.) তাল নবমী তিথিতে পিতা শিবচন্দ্র চক্রবর্তী ও মাতা মনোমোহিনী দেবীর জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীঅনুকূলচন্দ্রের জন্ম হয়। মা’র দেওয়া নাম অনুকূল। অনুকূল নামের চারটি অক্ষরের ব্যাখ্যা মা-ই করলেন কবিতার ছন্দে-

অ- অকূলে পড়িলে দীনহীন জনে

নু- নুয়াইও শির কহিও কথা

কূ- কূল দিতে তারে সেধো প্রাণপণে

ল- লক্ষ্য করি তার নাশিও ব্যাথা

এই ব্যাখার বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন অনুকূলচন্দ্র তার ৮১ বছরের দিব্য জীবনে। এক বন্ধুর মাধ্যমিক পরীক্ষা ফি এর টাকা না থাকায় নিজের পরীক্ষা ফি এর টাকা বন্ধুটিকে দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন শ্রীশ্রীঠাকুর। পরে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে কলকাতা যান। ডাক্তারী পড়া শেষে জন্মভূমি হিমাইতপুর ফিরে মানুষের দেহরোগের চিকিৎসায় আত্মনিয়োগ করেন। ব্যাপক সাফল্য এলো তাঁর চিকিৎসাসেবায়। মানুষের প্রকৃত সমস্যা তার মনে আর শারিরীক ব্যাধীর মূলেও রয়েছে মানসিক দুর্বলতা। তিনি মানসিক সংকট মোচনের জন্য গড়ে তোলেন কীর্ত্তণ দল। সংকীর্ত্তন মাঝে শুরু হয় তাঁর অবতারত্বের পূর্ণ প্রকাশ। কীর্ত্তন চলাকালীন সময়ে তাঁর ভাবসমাধিবস্থায় উচ্চারিত ব্রহ্মবাণী নিয়ে লিপিবদ্ধ গ্রন্থ, পূণ্য-পুঁথি, যা মানব জীবনের অমূল্য সম্পদ। তিনি পাবনার হিমাইতপুরের মতো অখ্যাত পল্লীতে গড়ে তোলেন লোক কল্যাণকর ‘সৎসঙ্গ’ প্রতিষ্ঠান যা ১২/১০/১৯২৫ খ্রিঃ তারিখ ১৮৬০ খ্রি. সংঘ নিবন্ধন বিধি-২১ অনুযায়ী নিবন্ধীকৃত (নিবন্ধন সংখ্যা ১২৮/১৯২৫-২৬) হয়ে সর্বপ্রথম সাংগঠনিকভাবে সংস্থা রূপে রাষ্ট্রীয় আইনগত স্বীকৃতি লাভ করে।

শ্রীশ্রীঠাকুর হিমাইতপুর সৎসঙ্গ অশ্রমে প্রতিষ্ঠা করেন সৎসঙ্গ তপোবন বিদ্যালয়, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কসপ, ক্যমিক্যাল ওয়ার্কসপ, কুটির শিল্প, ব্যাংক, পূতকার্য বিভাগ, মাতৃসঙ্ঘ, স্বাস্থ্য বিভাগ, কলাকেন্দ্র, আনন্দবাজার, গৃহনির্মাণ বিভাগ, ফিলানথ্রপি সহ নানা কর্মমুখী প্রতিষ্ঠান।

সৎসঙ্গ আশ্রম রূপ নেয় সর্বমতের অনুসারীদের মহাতীর্থস্থানে। এখানে ছুটে আসেন মহাত্মাগান্ধি, এ.কে. ফজলুল হক, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসূ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস সহ দেশ বিদেশের অগণিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এখানে এসে সব হারারা পেয়েছে সব পাওয়ার আনন্দ আর তাঁর চরণে আশ্রয় নিয়ে কোটি নরনারী পেয়েছে মানসিক প্রশান্তি। বিশিষ্ট উপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত মন্ত্র জপের মাধ্যমে নিজের জীবনে গভীর সংকট মোচনের কথা উল্লেখ করেছেন তার লেখা ‘কাছের ঠাকুর’ গ্রন্থে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জীবনে প্রধান বিষয় ছিল মানব জাতির জীবনবৃদ্ধিবাদ। মানব জীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধান তিনি দিয়েছেন তাঁর জীবন চলন এবং হাজার হাজার বাণীর মধ্যে। এ পর্যন্ত ১৩০ টিরও বেশি গ্রন্থে তা প্রকাশিত হয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুরের ২২ বছর বয়সে এক রাত্রিতে লিপিবদ্ধ সত্যানুসরণ গ্রন্থটি প’ড়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিস্মিত হয়েছিলেন। ধর্ম সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুরের উক্তি ‘ধর্ম হচ্ছে বাঁচা বাড়ার বিজ্ঞান।’ ‘ধর্মে সবাই বাঁচে বাড়ে, সম্প্রদায়টা ধর্ম নাড়ে’। এই সংজ্ঞা নির্দিষ্ট কোনো মতের নয়-এ হচ্ছে সর্বজনীন। ‘মানুষ নিজের ও তার পরিবার এবং পারিপার্শ্বিকের বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার পথে যা অনুকূল তা-ই ধর্ম, আর তার বিপরীতে যা কিছু তা-ই অধর্ম’ -শ্রীশ্রীঠাকুরের বিজ্ঞানসম্মত এই ধর্ম ব্যাখ্যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চাবিকাঠি। মাতৃভূমির প্রতি শ্রীশ্রীঠাকুরের আকুলতায় শ্রীশ্রীঠাকুরেরই ঐকান্তিক আকুল আগ্রহে শ্রীশ্রীঠাকুর ভক্ত-অনুরাগিরা ১৯২৫ খ্রিঃ নিবন্ধিত সৎসঙ্গ সংগঠনের ধারাবাহিকতায় ৬ডিসেম্বর ১৯৬৮খ্রি. তারিখে ‘হিমাইতপুর পাবনা সৎসঙ্গ’ নামে পুনঃনিবন্ধিত করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে মানবকল্যাণের আকাঙ্খায়।

তাঁর প্রিয় জন্মভূমি হিমাইতপুরধামে ফিরে আসার আকুলতায় ১৩৭৫ বঙ্গাব্দের ১২ মাঘ (২৬ জানুয়ারী ১৯৬৯খ্রি.) ভারতের দেওঘরে তাঁর লৌকিক জীবনের প্রয়াণ ঘটে। শ্রীশ্রীঠাকুরকে ভালবেসে শ্রীশ্রীঠাকুরের নামটি সংঘের সাথে যুক্ত করাটা ছিল সাধারণ ভক্ত প্রাণের আকুতি। ১৩৭৯ বঙ্গাব্দের ১ আশ্বিন (১৮সেপ্টেম্বর ১৯৭২খ্রি.) পরমতীর্থ হিমাইতপুরধামে অনুষ্ঠিত সংঘের সাধারণ সভায় সংঘের নাম ‘হিমাইতপুর পাবনা সৎসঙ্গ’ এর স্থলে ‘শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলন্দ্র সৎসঙ্গ, হিমাইতপুর-পাবনা’ রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তখন থেকে অদ্যাবধি সংঘের নাম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলন্দ্র সৎসঙ্গ, হিমাইতপুর-পাবনা নামে প্রতিষ্ঠিত, পরিচিত ও সমুজ্জ্বল। এই সংঘকে কেন্দ্র করে দেশের সমস্ত জেলা, উপজেলা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং বিভিন্ন দেশে শাখা সংগঠন ও শাখা সৎসঙ্গ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯২৫ খ্রিঃ সৎসঙ্গ নামে যে সংগঠনের প্রতিষ্ঠা হয়েছে, ২০২৫ খ্রিঃ এই সংগঠনের ১০০ বছর পূর্তিতে কেন্দ্র ও শাখা সংগঠন সমূহ বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে সংঘ নিবন্ধনের শতবর্ষ উদযাপন করছেন।

দেশ বিভাগের পর তদানিন্তন পাকিস্তান সরকার শ্রীশ্রীঠাকুরের ২০০ বিঘা বাড়ী, জায়গা-জমি ও স্থাপনা অধিগ্রহণ করে নেয় এবং পরে সেখানে মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন । গুরুর জন্মভূমিতে ভক্তবৃন্দের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে বাংলাদেশ সরকারের নিকট দীর্ঘদিন আবেদন করে আসছে সংগঠনটি। সরকারের কাছে বিনম্র আকুতি জানায়- ‘শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মভূমি বিশ্বের সকল শ্রীশ্রীঠাকুর ভক্ত অনুরাগীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক’।

বর্তমানে বিশ্বে ১০ কোটিরও ঊর্ধ্বে ভক্ত শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করে দীক্ষানুচলনে চলার চেষ্টায় রত। হিমাইতপুরধামে প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ আশ্রমে প্রতিদিন আশ্রম দর্শনার্থী শত শত নর- নারী নিঃশর্ত সেবা পেয়ে ধণ্য হন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ১৩৮ তম শুভ আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলন্দ্র সৎসঙ্গ, হিমাইতপুর-পাবনা আশ্রমে ২দিন ব্যাপী মহোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। দেশ বিদেশের অসংখ্য ভক্তের পদচারণায় পরমতীর্থ হিমাইতপুরধাম মুখরিত হবে। শ্রীশ্রীঠাকুরের ১৩৮তম আবির্ভাব তিথিতে স্মরণ করি তাঁর আশিস বাণী ‘……. বিদ্বেষকে অবদলিত কর, হিংসাকে চির বিদায় দাও, অতৃপ্তিকে অবলুপ্ত কর- প্রেম তোমাদের ভিতর অচ্ছেদ্যভাবে জাগরিত থাকুক। শান্তি দাও, শান্তি লাভ কর,- প্রতিপ্রত্যেকে শান্তিতে উচ্ছল হয়ে থাক-………….।’-বন্দেপুরুষোত্তমম্

লেখক-

সৌমিত্র মজুমদার,

সহ-সাধারণ সম্পাদক,শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ, হিমাইতপুর-পাবনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *